আমরা সবাই সংখ্যালঘু

  • we_are_not_a_minority1978

East London মসজিদের সামনে গত ১২ মার্চ EDL (English Defense League) মুসলিম কমিউনিটি এবং মসজিদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে এসেছিল। তারা প্রায়ই এরকম প্রতিবাদ কর্মসূচি দিয়ে থাকে। EDL ইংল্যান্ডের একটি Far Right গ্রুপ, যারা মূলত ইংল্যান্ডে বসবাসরত মুসলিম এবং ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ কর্মসূচী পালন করে। এদেরকে  ইসলামোফোবিক হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

গত শনিবারে তাদের প্রতিবাদের সংবাদটা দেখার পর ব্যাপারটা নিয়ে ভাবছিলাম অনেক। ধরেন EDL যখন তাদের দেশে অন্য একটা ধর্মকে সহ্য করতে পারছেনা, তখন আমি সংখ্যালঘু মুসলিম হিসেবে এতে অফেন্ডেড হচ্ছি। আমার খারাপ লাগছে। আবার EDL তাদের অবস্থান থেকে কিন্তু নিজেদেরকে ঠিক মনে করছে, কারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ খ্রিষ্টানদের দেশে কেন মুসলিমরা থাকবে, এটা তাদের পেরেশানির কারণ। অথচ এখানে খ্রিস্টানরা নিজেরাও কিন্তু খুব বেশি ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলেনা, না ব্যক্তি জীবনে, না সামাজিকভাবে। ধর্মটা তাদের কাছে স্রেফ ক্রিসমাস আর পার্টি ফার্টিতে রূপ নিয়ে নিয়েছে বহু আগেই। এরপরও তারা ধর্মের ভিত্তিতেই মুসলিমদেরকে সংখ্যা লঘু কাউন্ট করছে।

এদিকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ আমার বাংলাদেশে অনেকেই সংখ্যালঘু বিশেষ করে হিন্দুদের উপর নির্যাতন চালায়। যদিওবা এগুলোতে রাজনৈতিক এবং ব্যক্তিগত অনেক কারণই জড়িত। আমি নিজে সচেতন নাগরিক  হিসেবে এর প্রতিবাদ করি, বাবা মা এবং আমার ধর্ম আমাকে শিখিয়েছে  সব সময় অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে। কিন্তু EDL এর মত বাংলাদেশেও অনেক মানুষ আছে যারা হিন্দুদের উপর এইসব অত্যাচারকে সমর্থন করে। এক্ষেত্রে সরকার বা বিরোধী রাজনৈতিক দলেরও অনেকেই একি রকম আচরণ করে।

ঠিক ভারতেও একিভাবে মুসলমানরা সংখ্যা লঘু, সেখানে আবার কট্টরপন্থী হিন্দুরা গরুর গোস্ত খাবার মত তুচ্ছ ঘটনায় মানুষ খুন করে।

আমি যখন আমার দেশে বাস করি তখন মুসলিম হিসেবে আমি সংখ্যাগুরুদের কাতারের মানুষ, ঠিক সেই আমিই ইংল্যান্ডে সংখ্যালঘুদের কাতারে পরে যাই সেই ধর্মের ভিত্তিতেই। এই যে স্থান ভেদে আমার সামষ্টিক পরিচয় পরিবর্তন হচ্ছে, এগুলো কিছুতেই মুছে ফেলার মত জিনিস নয়। বরং চরম বাস্তবতা। কিন্তু সমস্যাটা হয় যখন আমরা Empathetic বা সমানুভূতিক হতে পারিনা। অন্যের বিশ্বাসকে সম্মান দিতে পারা এবং তাদের যায়গায় নিজেকে বসিয়ে অনুভব করতে পারা টা একটা অত্যন্ত জরুরী বিষয়। EDL যখন ইসলামের বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়, বা যখন শুধুমাত্র মুসলিম পরিচয়ের কারণে কাওকে হত্যা করা হয় তখন আমার যেমন কষ্ট লাগে, তেমনি বাংলাদেশে শুধুমাত্র সংখ্যায় কম হবার কারণে পেশি শক্তি খাটিয়ে যখন হিন্দুদের উপর অত্যাচার করা হয়, তখনোও আমার এটা বুঝা উচিৎ যে হিন্দুদেরো ঠিক একই রকম কষ্ট হচ্ছে।  পাশাপাশি বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের উপর যখন নির্যাতন হয়, তখন তাদের পাশে দাঁড়াবার মত মানসিক অনুভূতিটা আমাদের রাখতে হবে, কারণ এমনও হতে পারতো যে, আমার জন্ম হতো ভারতে, একজন মুসলিম হিসেবে এবং আমি তখন ওখানে সংখ্যালঘু হিসেবে কিন্তু ঠিকই নিরাপত্তা আশা করতাম।

সীমান্ত, দেশ, জাত পাত সব কিছু নিয়েই একটা উচ্চ শ্রেণীর মানুষেরা তামাশা করে এসেছে। বিভিন্ন পলিসি নির্ধারণ কিংবা রাজনৈতিক খেলায় ধর্মীয় অনুভূতিকে গুটি হিসেবে ব্যবহার করে সুবিধা হাসিল করে এসেছে তারা, এখনও করছে। তাদের এই  খেলায় খেলায় শত শত ভাঙ্গন হয়েছে সারা পৃথিবী জুড়েই। সেখানে সাধারণ মানুষেরাও বিষে নীল হয়েছে এক দল অন্যদলের বিরুদ্ধে। অখণ্ড ভারতে যখন মুসলিমরা সাংবিধানিকভাবে সামাজিক মর্যাদা এবং নিরাপত্তাসহ তাদের দাবী দাওয়া পেশ করলো, রাজনৈতিকভাবে প্রচেষ্টা চালিয়েও তারা এই দাবীগুলো আদায় করতে পারেনি, তৎকালীন হিন্দু প্রধান সমাজের উচ্চ শ্রেণীর দাদারা মুসলমানদের অধিকার দিতে চায়নি বলেই কিন্তু মুসলমানরা আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র চেয়েছে, যেখানে তারা মর্যাদা এবং সম্মান নিয়ে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে। এবং সেটা তারা করেছে। এবং সেই প্রচেষ্টার কারণেই কিন্তু আজকের বাংলাদেশ আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র  হিসেবে মর্যাদার সাথে দাঁড়িয়ে আছে।

কিন্তু ইদানীং যখন দেখি, সেকুলারিজম এর নামে ইসলাম ধর্মকেই এই দেশে সামগ্রিকভাবে একটা সংখ্যালঘু ধর্মের মত ট্রিট করা হয়, তখন আমারো ঠিক EDL দের মত ভয় হতে শুরু করে, কেন এটা হচ্ছে ? কিভাবে হচ্ছে ? এর ফলাফল কি হতে পারে ?

অবস্থা এমন যে দেশে ইসলাম পালন করা দিনে দিনে কঠিন হয়ে  যাচ্ছে। সেকুলারিজম মানেই এখন হিন্দু ধর্মের আচার অনুষ্ঠান পালন। আমি মুসলিম, আমার আলাদা একটা ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান থাকতেও নিজেকে সেকুলার প্রমাণ করার জন্য আমাকে অন্য ধর্মের অনুষ্ঠান পালন করতে হবে কেন ?

বরং যেটা হবার কথা ছিল, হিন্দু মুসলমান সব ধর্মের মানুষেরা যেন তাদের ধর্ম ঠিকভাবে, স্বাধীনভাবে, কোন রকম বাঁধা বিপত্তি ছাড়া যেন পালন করতে পারে, সেটা নিশ্চিত করার নাম হবার কথা ছিল সেকুলারিজম। কিন্তু সেকুলারিজমের সংজ্ঞা একদল এমনভাবে বদলে দিয়েছে যে, এখন সেকুলারিজম মানেই মুসলিমদের বিরুদ্ধাচরণ।

আমি নিজে তো চাইবোনা যে একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ নিজেকে সেকুলার প্রমাণ করার জন্য আমার ধর্ম পালন করুক।

এই দুটো ধর্মের আলাদা আলাদা যে বৈশিষ্ট্য, তার মধ্যে যে বৈচিত্র্য, এটাতেই সামাজিক একটা সৌন্দর্য আছে। সামাজিকভাবে দুই জাতির মানুষ একে অপরকে শ্রদ্ধা করবে কিন্তু কেউ কারো ধর্ম কারো উপর চাপিয়ে দেবে না, এটার নামই হবার কথা ছিল সেকুলারিজম।

কিন্তু আজকে আপনি যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ একটা দেশের ধর্মকে এমন খেলো বানিয়ে দেন, তাদের ধর্মকে যাচ্ছেতাই-ভাবে হেয় করেন, আবার এটাকে নাম দেন সেকুলারিজম, তাহলে আমি অবশ্যই অফেন্ডেড হবো। এই অফেন্ডেড হওয়াটা আমার অধিকার। ম্যাজরিটি মুসলমানের দেশে ইসলাম ধর্ম চর্চ নিয়ে যখন নানা হয়রানীর শিকার হতে হয়, তখন  সংখ্যাগুরুকে সংখ্যালঘুর চেয়েও খারাপভাবে ট্রিট করা হচ্ছে। এবং এটাকে নাম দেয়া হচ্ছে সেকুলারিজম।

সাম্প্রদায়িক যে শব্দটা ব্যবহার করা হয় বার বার আমাদের দেশে, যারা এই শব্দটা ব্যবহ্যার করে তারা নিজেরাই যে চরম সাম্প্রদায়িক আচরণ করে মুসলিমদের সাথে, সেটা কিন্তু তারা স্বীকার করেনা। অথচ সাম্প্রদায়িক শব্দটা নিয়ে সব থেকে বেশি রাজনৈতিক চালবাজি হয়, ব্যবস্যা হয়, মানুষকে উসকানি দেয়া হয়। এর ভিক্টিম হয় হিন্দু মুসলিম সবাই।

সে যাইহোক, ইসলাম আমাকে সংখ্যালঘুদের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট আচরণবিধি এবং অধিকারের নিয়মাবলী শিখিয়ে দেয়। ইসলাম আমাকে বলে, অন্য যে কোন ধর্মের মানুষের সুরক্ষার দায়িত্ব মুসলিম হিসেবে আমার জন্য একটা বড় দায়িত্ব। আমার আশেপাশে যদি কেউ সংখ্যালঘু হবার কারণে কাউকে অত্যাচার করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট প্রতিবাদ করা আমার জন্য অপরিহার্য। নইলে এর জন্য কিন্তু আল্লাহর কাছে আমাকে জবাবদিহি করতে হবে।

Facebook Comments

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.