ইতিহাসে মুসলিম নারী ও বর্তমান মুসলিম সমাজ

শিক্ষা একজন নারীকে করে তোলে সুযোগ্য। পৃথিবীর তাবত বাঁধাকে পেরিয়ে একজন নারীও সমাজ, দেশ তথা পৃথিবীর জন্য অসামান্য ভূমিকা পালন করতে পারে। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)নারীদের মতামত এবং যোগ্যতাকে সব সময় গুরুত্বের সাথে দেখেছেন। যার ফলে রাসূলের যুগের নারীরা প্রসাশন, অর্থনীতি, ব্যবসা, রাজনীতি, বিচারকার্য সহ সব ধরনের অঙ্গনে পুরুষের পাশাপাশি অবদান রেখেছেন। তারা ছিলেন শিক্ষিকা, চিকিৎসক, বিচারক, পরামর্শ সভার সদস্যা এবং আরও অনেক কিছু।
ইসলামের প্রাথমিক যুগের নারীদের কিছু উদাহরণ:
১। হযরত ওমর (রা:) তার খিলাফাত কালে একবার মঞ্চে দাঁড়িয়ে ঘোষনা দিলেন, মানুষেরা এখন থেকে তাদের বউদের জন্য অতিরিক্ত মাহর ধার্য করতে পারবেনা। তিনি উপস্থিত পুরুষদের উদ্যেশ্য করে বললেন ৪০ আউন্স এর বেশি মাহর ধার্য হলে বাকিটা রাজ্য কোশাগার এ জমা দেয়া হবে।ওমর (রা:) মঞ্চ থেকে নেমে গেলে, উপস্থিত মহিলাদের থেকে একজন মঞ্চে উঠে দাঁড়িয়ে গিয়ে বললেন “এটা তুমি করতে পারোনা, এটা তোমার এখতিয়ার এ নেই। হযরত ওমার জিজ্ঞেস করলেন কেন এটা আমার এখতিয়ার এ নেই? তখন মহিলাটি সূরা নিসার ২০ নাম্বার আয়াত তিলাওয়াত করলেন।
“যদি তোমরা স্ত্রীর পরিবর্তে অন্য স্ত্রী গ্রহণের সিদ্ধান্ত নাও, সে ক্ষেত্রে তাদের একজনকে মোহরানা হিসেবে প্রচুর অর্থ দিয়ে থাকলেও তা থেকে কিছু ফেরত নিও না। তোমরা কি মোহরানা ফেরত নেয়ার জন্য স্ত্রীদের ওপর মিথ্যা অপবাদ চাপিয়ে দেবে এবং প্রকাশ্য পাপাচারে লিপ্ত হবে?”
এটা শুনে ওমর (রা:) বললেন, মহিলা ঠিক বলেছেন এবং ওমরের ভুল হয়েছে। মনে হচ্ছে সবার ওমর এর থেকে অনেক গভীর প্রজ্ঞা এবং জ্ঞ্যান রয়েছে।
ঘটনাটিতে কয়েকটি বিষয় লক্ষ্য করার মত, ওমার (রা:) এর খিলাফাত মানে তখন মহিলাদের পর্দার ব্যপারে সব নির্দেশনাগুলো প্রতিষ্ঠিত। সেই সময়ে মহিলারা সামাজিকভাবে কতটা সাহসের সাথে এবং আত্মবিশ্বাস নিয়ে অংশ নিয়েছেন। এবং ওমার (রা:) তাকে কত বীনয়ের সাথে গুরুত্ব দিয়ে নিজের ভুল স্বীকার করলেন, নারী বলে ওমর কিন্তু তাকে অস্বীকার করেননি।
২। মহানবী (সা:) সীফাত বিনতে আবদুল্লাহ ইবনে সামস কে মদিনার সব থেকে বড় মার্কেটের পরিচালক এবং হিসাব রক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন। পরবর্তিতে তার দক্ষতা এবং সততার জন্য ওমার (রা:) খলিফা হলে তাকে পুনরায় একি পদে নিয়োগ দেন। আল্লামা ইবনে আব্দ আল বার এর মতে, সীফাত বিনতে আবদুল্লাহ খুব বুদ্ধিমতী এবং পন্ডিত ছিলেন। ওমার (রা:) প্রায়ই বিভিন্ন বিষয়ে তার পরামর্শ নিতেন।ওমার (রা:) হযরত উম্ম হাকিম বাইযা কে খিলাফাত পদে নিয়োগ দেন। তিনি ছিলেন মহানবী (সা:) এর ফুফু এবং শিক্ষিতা(আল মুহাদ্দিদাদ-শায়খ আকরাম নদভী)
৩। ফাতিমা বিন কাইস ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমতি এবং জ্ঞ্যানী পন্ডিত। হযরত ওমার (রা:) যখন মারা গেলেন, তখন পরবর্তি খলিফা নির্ধারনের জন্য গঠিত কমিটি ফাতিমা বিন কাইস এর কাছ থেকে পরামর্শ গ্রহন করে। আবু বকর (রা:) এর কন্যা আছমা বর্ননা করেন, যুবাইর এর সাথে যখন তার বিয়ে হয় তখন তারা অনেক অর্থ সংকটে ছিল। মহানবী (সা:) তাদেরকে কিছু জমি দেন, যেটা তাদের বাড়ি থেকে দুই মাইল দূরে ছিল। আছমা নিজে সেই জমিতে চাষ করতেন এবং নিজেই সেগুলো বিক্রির ব্যবস্থা করতেন।
আছমা বিনতে আবু বকর বলেন, একদিন আমি মাথায় খেজুর নিয়ে বাসায় ফিরছিলাম। পথে আমার সাথে মহানবীর (সা:) দেখা হয়, তিনি তখন মদিনা থেকে আগত কিছু মানুষের সাথে ছিলেন। তিনি আমাকে তার উটের পিঠে চরে বাড়ি ফিরতে বললেন।
৪। নাফিসা বিনতে আল হাসান ইমাম শাফিই (রা:) কে হাদীস শিক্ষা দিয়েছেন।
ইবনে হাজার ৫৩ জন নারীর সাথে এক যোগে শিক্ষা গ্রহন করেছেন। তিনি ১২ জন নারীর কথা উল্লেখ করেন, যাদেরকে মুসনিদা বলা হত। তারা ইতিহাস সংরক্ষন এবং সংগ্রহ করতেন (আল মুহাদ্দিদাদ)।
কিন্তু রাসূল যে নারীদের এতটা গুরুত্ব দিয়েছেন, এটা যে তার আদর্শ এটাকে পরবর্তিতে মুসলিম সমাজের দায়িত্বশীলগন (আল্লাহকে পুরুষকে দায়িত্বশীল করেছেন) ধীরে ধীরে ভুলে যেতে বসে। ফলে সামাজিকভাবে নারীদের শিক্ষা থেকে শুধু বঞ্ছিত করা হয়নি বরং তাদেরকে ঘরের মধ্যে বন্দী করা হয়েছে ইসলামের দোহাই দিয়ে। নারীদের প্রতিভা বিকাশের পথ কে যে শুধু রুদ্ধ করা হয়েছে তা না, তাদেরকে এমন এক অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে যে, সমাজে পুরুষের পাশাপাশি তার অস্ত্বিত্বকে অস্বীকার করা হয়েছে। ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা, ফতোয়া দিয়ে দিয়ে তাদেরকে সমাজ থেকে এমনভাবে আলাদা করা হয়েছে যে, এখন পর্দা মানেই একজন নারী পুরুষের সামনে আসতে পারবেনা। যা কিনা ইসলামের প্রাথমিক যুগের নারীদের অবস্থান থেকে সম্পূর্ন বিপরীত।
গত শতাব্দী পর্যন্ত মুসলিম মহিলারা ঘর থেকে বের হতে পারবে কিনা এটা নিয়ে ঘোর আপত্তি ছিল। এসব দেখে মনে হয় পুরুষ শাসিত মুসলিম সমাজ রাসূল এর সীরাত থেকে, এবং পরবর্তি সময়ের নারীদের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কে রিতিমত অস্বীকার করে তাদের জগতকে আলাদা করে ফেলেছিল।
ভারতীয় উপমহাদেশ সহ বিশ্বের অনেক দেশেই নতুন করে মুসলিম নারীদের শিক্ষা গ্রহনের জন্য আন্দোলন করতে হয়েছে। বেগম রোকেয়া বাংলার মুসলিম নারীদের শিক্ষার জন্য এক মাইল ফলক হয়ে আছেন।সেজন্যই বাংলাদেশের বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ শাহ আব্দুল হান্নান বেগম রোকেয়াকে একজন ইসলামী চিন্তাবিদ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, তিনি বলেন;
বেগম রোকেয়া ছিলেন একজন চিন্তাবিদ। সে সাথে সত্যিকার অর্থেই একজন ইসলামী চিন্তাবিদও ছিলেন। যিনি ইসলামের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে চিন্তাভাবনা, গবেষণা ও ব্যাখ্যা করেন তিনিই ইসলামী চিন্তাবিদ। তিনি ইসলাম সম্পর্কে বিভ্রান্তি বা ভুল দূর করেন। কাজেই এসব অর্থে বেগম রোকেয়াকে ইসলামী চিন্তাবিদ বলতে হবে। অবরোধ, নারী স্বাধীনতা, পর্দার প্রশ্নে, অশ্লীলতা, যৌতুক প্রথা, বিধাব বিবাহ, বাল্য বিবাহ, তালাক নিয়ে ভ্রান্তি ও বাড়াবাড়িসহ বিভিন্ন ধরনের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তিনি ইসলামের সঠিক অবস্থান তুলে ধরেছেন (দেখুন: একজন শ্রেষ্ঠ নারী বেগম রোকেয়া)
ইসলাম নারীকে মর্যাদা দিয়েছে, এটুকু বললেই কি দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়? হ্যাঁ, ইসলাম নারীর মর্যাদা দিয়েছে এটা কিতাবে আছে কিন্তু মুসলমানগন কি পরবর্তীতে এর বাস্তব উদাহরন প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে? মুসলিম নারীর শিক্ষার জন্যে কেন নতুন করে আন্দোলন করতে হল বা হচ্ছে? তাও আবার পাশ্চাত্যের প্রেসকিপশনে, যেখানে রাসূল (সঃ) এর যুগেই নারীরা সমান সুযোগ পেয়েছিল শিক্ষা, রাজনীতি, অর্থনীতি থেকে শুরু করে সব অংগনে?একজন ধর্মীয় অনুশাসন পালনকারী নারী হিসেবে এই ধরনের নায্য প্রশ্নগুলো উথ্থাপন করলে তাকে নারীবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করার চেষ্টাটা কি ইসলামিক?
মুসলিম পুরুষদের একটা অংশ নারীদের যোগ্যতাকে অস্বীকার করলেও ইতিহাস নারীদের উজ্জ্বল অবদানগুলোকে অস্বীকার করেনা। ইতিহাসে মুসলিম নারীরা এমনও প্রমান রেখেছে যে, তারা একসময় রাজ্য শাসন করেছেন, চিকিৎসক হিসেবে যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন, সমাজ সংস্কারক হিসেবে সমাজকে দিয়েছেন অগ্রগতি, জ্ঞ্যানের সাধন, হাদীস সংরক্ষক, শিক্ষাদান ছিল তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের তুলিতে পৃথিবী দেখেছে ইতিহাস ঐতিহ্যের নিদর্শন। ইতিহাস থেকে এমন কিছু নারীদের নিয়ে এই লেখার প্রচেষ্টা।
জনগন দিল্লীর রাস্তায় রাযিয়া! রাযিয়া! বলে স্লোগান দিচ্ছিল। তাদেরকে নেতৃত্ব দিচ্ছিল লাল পোশাক পরিহিতা একজন মহিলা, মুখে তার দৃঢ় সংকল্প এবং সাহসের শক্তি। নাম তার রাযিয়া সুলতান
ভারতের সম্রাট শামস আল দীন এর পুত্র সন্তানরা ছিল মদ্যপ, তারা আড্ডা এবং ভোগ বিলাশে মত্য। সম্রাট তার মেয়ে সুলতানা রাযিয়ার মধ্যে খুঁজে পেয়েছিল খোদাভীতি এবং প্রজ্ঞা। তাই সম্রাট শামস আল দীন রাযিয়াকে তৈরি করেছিলেন একজন শক্তিশালী এবং যোগ্য ব্যক্তি হিসেবে। তাকে এমনভাবে গড়ে তোলা হল যে সে সিপাহশালার এনং রাজ্য পরিচালনার জন্য সুযোগ্য হয়ে উঠে। সম্রাট রাযিয়া জনসম্মুখে রাজ্যে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী ঘোষণা করেন। কিন্তু সম্রাটের মৃত্যুর পর রাজ্যসভা একজন নারীকে সম্রাজ্ঞীর আসনে দেখতে চাইলনা। ফলে রুকন আল দীন কে সিংহাসনে বসানো হল, যে কিনা ছিল মদ্যপান ও ভোগ বিলাশে মশগুল।
রুকন আল দীনের রাজ্য পরিচালনায় কোন মনযোগ ছিলনা কখনও। বরং তার মদ্যপান আরো বেড়ে গেল এবং সে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে শুরু করুলো। সাধারন মানুষের এমন সম্রাট এর উপর হতাশ এবং ক্রোধে ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এদিকে রাযিয়াকে গুপ্ত হত্যার প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছিল যেন সে কিছুতেই সিংহাসনে বসতে না পারে। কিন্তু পরবর্তীতে রাযিয়া রাজ্য আসনের দায়িত্ব গ্রহন করেন।
রাযিয়ার ছোটভাই কিতাব আল দীনকে হত্যা করা হলে সে প্রচন্ড ক্ষুব্ধ হয়ে পরে। সে লাল রঙের একটি পোশাক পরিধান করে সে জনগনকে সাথে নিয়ে এর প্রতিবাদ করে। লাল পোশাক মূলত ছিল প্রতিবাদের রঙ। ১২৩৬ খ্রীষ্টাব্দে জনগন রাযিয়াকে সমর্থন করে মসজিদে জড়ো হয় এবং সেখান থেকে তাকে নিয়ে জনগন প্রাসাদ দখল করে এবং রানী হিসেবে সিংহাসনে বসিয়ে দেয়। জনগনের এত ব্যপক সমর্থন নিয়ে ইতিহাসে এই প্রথম কোন নারী রাজ্য শাসনভার গ্রহন করে।
তিনি ছিলেন একজন সুযোগ্য রানী, যিনি শত শত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কুপ এবং রাস্তা নির্মান করেন। রাজ্যে শিক্ষা বিস্তারের জন্য তার অসামান্য প্রচেষ্টা এবং উদ্যোগ দিল্লীকে দিয়েছে অগ্রগতির সুযোগ। তার সময়ে বিজ্ঞান চর্চা ব্যপক বৃদ্ধি পায়। তিনি তার শাসনামলে অনেক সংস্কার নিয়ে আসেন। মানুষে মানুষে বিভেদ কমিয়ে আনার জন্য তিনি তার রাজ্য সভায় সব ধর্ম বর্নের মানুষকে নিয়োগ দেবার উদ্যোগ নেন। তিনি রাজ্যের গুরুত্বপূর্ন পদে একজন কৃষ্ণাংগকে নিয়োগ দেন, যার নাম ছিল ইয়াকুব। এছাড়া একজন হিন্দু ব্যাক্তিকেও নিয়োগ দেবার উদ্যোগ নেন, কিন্তু রাজ্যসভায় এর বিরোধিতা হয়। রাযিয়া তার ধীরস্থিরতা এবং বিনয় এর জন্য সুপরিচত ছিলেন। তিনি ১২৪০ সালে মারা যান (Razia Queen of India, Salman Asif)
রেফারেন্স:
১। আল মুহাদ্দিদাদ-আকরাম নদভী
২।একজন শ্রেষ্ঠ নারী বেগম রোকেয়া, শাহ আব্দুল হান্নান
৩। Extraordinary Muslim Women, Razia Queen of India, Salman Asif, cited in Arif Khan, Newspaper Al-Sindi’s Garden
Facebook Comments

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.