জীবন থেকে নেয়া – ৩

ঠাকুরগাঁও এর একটা সাদামাটা গ্রাম হলুদবাড়ি। আব্বা তখন হলুদবাড়ি প্রাইমারী স্কুলের প্রধান শিক্ষক। সেই স্কুলে আব্বা খুঁজে পেল কমলাকান্তকে। অসাধারণ মেধাবী এক ছেলে। ওর হাতের লেখা এত মনোমুগ্ধকর ছিল যে আব্বা ওর পরীক্ষার খাতাগুলো বাসায় নিয়ে আসতেন আমাদের দেখাবার জন্য।

কমলাকান্ত যে অসহায় নি:স্ব বাবার সন্তান হিসেবে এই পৃথিবীতে এসেছিল, সেই বাবার সাধ্য ছিলনা কমলাকান্তর মেধাকে পরিচর্চার সুযোগ করে দেবার। বাবার সাথে কমলাকান্তকে ক্ষেতে কাজ করতে হত আহার যোগাবার জন্য।

আব্বা কমলাকান্তর ব্যাপারে প্রায়ই বলতেন আমাদের। আব্বা ভীষণ আশাবাদি ছিল যে কান্ত অবশ্যই একদিন ভাল যায়গায় পৌছাবে, ভাল ক্যারিয়ার হবে। সেভাবেই কান্তকে গাইড করে আসছিল আব্বা।

পঞ্চম শ্রেনীতে বৃত্তি পেল আর আব্বা কান্তকে নিয়ে ঠাকুরগাঁও জেলা স্কুলে ভর্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা করলেন। ভর্তি পরীক্ষায় চমক দেখিয়ে কান্ত প্রথম হল। কিন্তু তার বাবা কিছুতেই চায়না সে গ্রাম ছেড়ে শহরে গিয়ে পড়ুক। বাবাকে ক্ষেতের কাজে সাহায্য না করলে যে সংসার চলবেনা! আব্বা ওর বাবাকে বুঝাতে চেষ্টা করে ব্যার্থ হল।

কমলাকান্তের জেলা স্কুলে পড়া হলনা। গ্রামের একটা হাইস্কুল থেকে অনেক ভাল ফল নিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছিল। যদিওবা নানা কারনে বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার সুযোগ তার হয়নি।
আব্বা চেষ্টা করেছে যতটুকু সাহায্য করা যায়। সব থেকে বড় কথা, আব্বা শিক্ষক হিসেবে তাকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল অনেক।

কোন কোচিং ছাড়াই কমলাকান্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে পড়ার সুযোগ পেল। এরপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। সে এখন আর গ্রামের সেই অসহায় দরিদ্র বাবার সন্তানটি নেই। পরিশ্রম আর মেধা দিয়ে সে নিজের স্থান তৈরি করে নিয়েছে।

এরকম লক্ষ লক্ষ কমলাকান্তের কাহিনী সমগ্র হয়ে আছে পুরো বাংলাদেশ। অসহায় দরিদ্রাবস্থা থেকে উঠে এসে কত দু:খ কষ্ট পাড়ি দিয়ে এরা অবদান রাখে দেশের জন্য।

Facebook Comments

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.