নারী যখন সামাজিক উদ্যোক্তা

  • image001_561427ed40514

নারী শিক্ষার প্রসারের পাশাপাশি কয়েকটা দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের নারী সমাজ। এর মধ্যে প্রধান একটি জড়িত নারীর পেশাকে কেন্দ্র করে। এখন যখন মেয়েরা অধিক হারে শিক্ষিত হচ্ছে, এই অবস্থায় চাকরী করা কিংবা না করাটা একটা সামাজিক চাপের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাস্টার্স পাশ করা একটা মেয়ে যদি শুধুমাত্র ঘর সামলাবার দায়িত্ব নেয়, তাহলেও সে একটা সামাজিক চাপের মধ্যে পরে যায়। কিভাবে ? আসেপাশের এ ও এসে জানতে চাইবে, কিচ্ছুই করছোনা ? কোন চাকরী ? যেন চাকরী না করাটা একটা আদিমতা। অথচ একটা শিক্ষিত মেয়েকে যে কেবল দশটা পাঁচটার অফিসই করতে হবে এটা কোন শর্ত তো নয়। বাস্তবে, এটা কারো জন্যই শর্ত নয়।

একটা শিক্ষিতি মেয়ে যদি সত্যিকারের চিন্তাশীল, কর্মোদ্যমি এবং সৃষ্টিশীল হয়ে থাকে, সে যদি সমাজের জন্য ভাবে, তাহলে তার মাধ্যমে সমাজের অনেক সেক্টর নিয়েই কাজ করা সম্ভব। পৃথিবীর এই যে এত বয়স হয়েছে, কালের পরিক্রমায় আমরা দেখেছি কত কত নারী সমাজের অগ্রগতির জন্য কাজ করেছেন। তারা সকলে দশটা পাঁচটার অফিস করেননি কিন্তু যা করেছেন তা সমাজকে দিয়েছে অনেক অনেক বেশি।

যেই বেগম রোকেয়ার আলোকবর্তিকায় আমাদের দেশের মেয়েরা শিক্ষার শিখা পেয়ে চলেছে, তিনি নিজেও কিন্তু একজন উদ্যোক্তা। তিনি যদি সমাজের অন্য নারীদের কথা না ভাবতেন তাহলে আমরা আজকে শিক্ষার সুযোগ থেকে হয়তো বঞ্চিত হতাম, কিংবা সমাজের গুটিকয় নারী শিক্ষার সুযোগ পেত।

অঢেল সময় কোন গঠনমূলক কাজ ছাড়া কিংবা টিভি সিরিয়াল দেখে পার করে দিচ্ছেন বাংলাদেশের অনেক শিক্ষিত নারী। যারা হয়তো দেশের জন্য এমন কিছু কাজ করতে পারতো যা তারা কল্পনাও করেনি। সংসার, সন্তান লালন পালনের পাশাপাশিও যে সমাজের জন্য ভাবা যায়, কিছু করার চেষ্টা করা যায় এই কনসেপ্ট টা দেশের মেয়েদের মাঝে প্রচার করা দরকার বেশি বেশি। প্রয়োজনে গাইড করা দরকার।

এমন না যে শুধু টাকা কামাই করার জন্যই বুটিকের ব্যবসা খুলে বসতে হবে। সমাজ কল্যানমূলক একটা ছোট্ট উদ্যোগও হয়ে উঠতে পারে একজন নারীর পরিচয়। আশেপাশের দুস্থ মানুষের জন্য কাজ করা, যে সমস্ত মহিলারা সুবিধা বঞ্চিত কিংবা অত্যাচার নির্যাতনের শিকার, কাজ করলে তাদের জন্য একজন নারী হয়ে উঠতে পারে আস্থার ঠিকানা।

মেয়েরা বেশিরভাগ অনেক সৃষ্টিশীল, শুধু তাদের সৃষ্টিশীলতার পরিচর্যাটা জরুরী। এক্ষেত্রে বরং দশটা পাঁচটার কাজ অনেক সৃষ্টিশীলতাকে কবর দিতে পারে। এই সময়টায় নিজের প্যাশন, ইচ্ছাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে নিজের মত করে কিছু একটা শুরু করতে পারলে, নিজেকে বিকশিত করা যায় অনেকগুন বেশি।

ভারতের একজন নারীর উদাহরণ না দিলে এই লেখার পরিপুর্নতা পাবেনা। তার নাম দেবী মুর্তি। সে পড়ালেখা করেছে আমেরিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেক্ট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ। এরপর সে ভারতে ফিরে যায় এবং Entrepreneurship নিয়ে মাস্টার্স করে। সে চাকরী খুজেনি। বরং সে গ্রামে গিয়ে কৃষকদের জন্য কম খরচে কিভাবে চাষবাসের জন্য যন্ত্র তৈরি করা যায় সেটা নিয়ে কাজ শুরু করে। এখন তার কোম্পানি Kamal Kisan সামাজিক উদ্যোগের জন্য পুরষ্কার তো পাচ্ছেই, সাথে সাথে ভারতের প্রত্যন্ত গ্রামের কৃষকরা অতি কম খরচে চাষের যন্ত্র সামগ্রী যেমন ট্রাক্টর, চারা রোপন যন্ত্র ইত্যাদি কিনতে পারছে।

একজন নারী আমার মনে হয় অনেক কিছু করতে পারে যদি শুধু সে একটা ছোট্ট উদ্যোগ নেয়। বাহিরে অনেক দূরে গিয়ে নয়, নিজের ছোট্ট জগত থেকেই অনেক কিছু করা সম্ভব। তখন সেই ছোট্ট জগতটাই হয়ে উঠতে পারে বিশাল একটা পৃথিবী। কিন্তু এই যে ভাল কিছু একটা করতে হবে, এমন একটা কিছু যা সমাজের জন্য, আশেপাশের মানুষের জন্য অনেক কল্যান বয়ে নিয়ে আসবে, এই মানসিকতাটা, এই চিন্তাশক্তিটা, ধারণাটা আমাদের সমাজের মধ্যে তৈরি করতে হবে। এই মুহুর্তে সবাই শুধু অর্থের পেছনে বেধুম ছুটে। কিন্তু একটা সামাজিক উদ্যোগও যে অর্থের যোগান দিতে পারে একটা পর্যায়ে গিয়ে এটা আমরা বেশিরভাগ মানুষ ভাবিনা।

ভাল একটা উদ্যোগকে সামনে এগিয়ে নিতে অনেকেই এগিয়ে আসে, যদি মানুষকে বোঝানো যায় ঠিক মত, উপস্থাপন করা যায় ঠিক মত, সর্বোপরি সততার সাথে, সত্যিকারের পরিবর্তনের নিয়তে কাজ করলে মানুষ আপনাকে সাহায্য করবেই।

বাংলাদেশে এই যে গৃহকর্মীদের উপর অত্যাচার হচ্ছে, এটা নিয়ে যদি নারীরা একটা আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে, তাদের অধিকার নিয়ে মাঠে নামতে পারে, তাহলে সমাজে একটা ব্যাপক পরিবর্তন আসা সম্ভব। কারন গৃহকর্মী অত্যাচারের ঘটনাগুলো সাধারণত নারীদের দিয়েই ঘটে।

আমাদের দেশে হত দরিদ্র অসহায় মানুষের অভাব নেই, কিন্তু তাদের জন্য কাজ করতে এগিয়ে আসার মানুষের অনেক অভাব। যারা স্বচ্ছল, হয়তো স্বামীর উপার্জনে সংসার অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দে চলে যাচ্ছে। আর বউটা ঘর সামলাচ্ছেন, সন্তান লালম পালন করছেন। এমন অবস্থায় একজন নারীর ঘর সামলাবার পাশাপাশি অনেকটা সময় এমনি এমনি কেটে যায়। আমি মনে করে এইসব নারীদের উপর সামাজিক দায়বদ্ধতা অনেক বেশি। আল্লাহ তাদের কে যোগ্যতা দিয়েছেন, শিক্ষা দিয়েছেন এবং আর্থিক স্বচ্ছলতাও দিয়েছেন। এখন যে সময়টা তারা পাচ্ছেন এই সময়টাতে সমাজের জন্য ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও কিছু করা জরুরী।

ফেইসবুকে হাজারটা ছবি আপলোডের থেকেও যে অনেক অনেক দরকারি কাজ আছে করার এই দিক নির্দেশনাটা পাচ্ছেনা কেউ। তাই এই মুহুর্তে দিক নির্দেশনা দেয়াটাই একটা মোক্ষম বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এর থেকেও বড় কথা, একজন নারী হিসেবে সমাজের সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য আমরা কতটুকু ভাবছি ? যদি না ভেবে থাকি,  চলুন এখন ভাবি, চারপাশের মানুষগুলোর দিয়ে তাকই। নিজেকে জিজ্ঞেস করি একজন মানুষ হিসেবে এই পৃথিবীর প্রতি কি কি দায়িত্ব আছে আমাদের?

যে কোন সৃষ্টিশীল কাজ বা উদ্যোগ যে শুধু সমাজের জন্য কল্যান বয়ে আনবে তা নয়, একটি উদ্যোগ আপনার জীবনকে করে তুলবে কর্মক্ষম, গতিময় এবং দেবে একটা লক্ষ্য, যা হয়তো জীবনের মূল্যমান বাড়িয়ে দেবে অনেক বেশি। আর পাওয়া ভাল কাজ করার এক অনাবিল আনন্দ।

Facebook Comments

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.