মনের পশু, সমাজের পশু

  • rumi2-1024x683

সবার ভেতরেই একটা পশু বাস করে। আর একটা ভাল স্বত্বা বাস করে যা ঐ পশুটাকে শেকলবন্দি করে রাখে। পার্থক্যটা এখানেই, কে কতটা সেই পশুটার লাগাম ধরে রেখে তাকে দমিয়ে রাখতে পারে তার উপরই নির্ভর করে মানুষ বিভিন্ন অপরাধ এবং ভাল কাজ করে থাকে।
যে ধর্ষক, এত নৃশংসতার সাথে ধর্ষণ এবং বিকৃত খুন করতে পারে, তার ভেতরের ভাল স্বত্বাকে পশু স্বত্বাটা ততদিনে নি:শেষ করে ফেলেছে নিশ্চয়ই। এখন তার পশু স্বত্বাটাই তার ভাল স্বত্বাটাকে সেকলে বন্দি করে ফেলেছে, যার ফলে তার দ্বারা যে কোন হিংস্রতা সম্ভব।
এই যে মানুষ নিজের ভেতরের পশু স্বত্বাটাকে দমন করে রাখে, এটা কিভাবে করতে পারে সে? অনেকগুলো উপাদানই এখানে কাজ করে। একটা শিশুর জন্মের পর থেকে তার বেড়ে উঠা, পরিবেশ, আশেপাশের মানুষ এবং তাদের আচার ব্যবহার এবং নৈতিক শিক্ষা, সব কিছুর একটা সন্নিবেশিত রূপ হয়ে ধরা দেয় মানুষের স্বত্বা। সে প্রতিনিয়ত আহরণ করে নানা উপাদান যা তার চিন্তা এবং আচরণে প্রকাশ পায়।
বাচ্চাদের সাথে কাজ করতে গিয়ে দেখছি আর শিখছি প্রতিনিয়ত। একটা সেশনের কথা বলি, ৫ টা বাচ্চাকে নিয়ে আছি একটা রুমে। তাদেরকে বিভিন্ন ধরনের activities এ engage করতে করেতেই একটা বাচ্চা অন্য একটা বাচ্চাকে আঘাত করে বসলো। যে বাচ্চাটাকে মারল, সে ততোক্ষণে কান্না শুরু করে দিয়েছে। বুঝলাম বেশ ব্যথা পেয়েছে। যাইহোক, আমি যে মেরেছে তাকে বললাম ও যেন Sorry বলে এখুনি। কিন্তু সে sorry বলতে নারাজ। আমি এক দুইবার request করতেই এবার সে নিজেও কান্না শুরু করে দিল। আমি এবার দুই জন কে আলাদা জায়গায় নিয়ে গেলাম কিছুক্ষণের জন্য। দুইজনের কান্না থেমে গেলে, যে মেরেছে সে শান্ত হয়ে sorry বলল এবার, এবং তারা দুজন হাই-ফাই ও করলো।
এই বাচ্চা-কাল থেকেই ভাল খারাপ আচরণ এর প্রবণতাগুলো একটু একটু করে থাকে, কিন্তু শিশুর মানসিক বিকাশের কথা যে আমরা বলি, এটার উপর আশেপাশের মানুষগুলো যেমন পরিবার, শিক্ষক, বন্ধু, আত্মীয় স্বজন, সবার প্রভাব পরে।
বাচ্চাদেরকে হাতে ধরে যেমন আমরা অক্ষর লেখা শেখাই, তেমনিভাবেই বিনয় প্রকাশের ভাষাগুলোও শেখাতে হয়। Sorry বলা, অন্যকে Priority দেয়া, বড়দের সম্মান দেখানো, Gratitude Express করা, সব কিছুই হাতে ধরে ধরে একটা বাচ্চাকে শেখাতে হয়।
এগুলো তো গেল প্রাথমিক উপাদান যা একটা শিশুর ভিত্তি তৈরি করে। কিন্তু পরিণত বয়সে গিয়েও মানুষের প্রতিনিয়ত check and balance এর মধ্য দিয়ে থাকতে হয়। এবং এটাই ভেতরের খারাপ স্বত্বাটার সাথে ভাল স্বত্বাটার চিরন্তন লড়াই, যাকে মূলত ইসলামে বলা হয়েছে বড় জিহাদ। এবং এই লড়াইটা একটা মানুষের ভেতরে একটা মুহূর্তের জন্যও থেমে থাকে না। ঘুম থেকে উঠা থেকে রাতে ঘুমাতের যাবার আগ পর্যন্ত।মানুষ এই লড়াই এর মধ্য দিয়ে সময় পার করে।
এখন মূল কথা হল, খারাপ স্বত্বা যা কিছু খারাপ তার প্রতি আকৃষ্ট করে মনকে convince করার প্রয়াস চালায়, আর ভাল স্বত্বাটা ভাল কিছুর প্রতি। কিন্তু যখন খারাপ স্বত্বাটা মানুষের ভেতরটা দখল করে বসে, ঠিক সেই সময় থেকেই তো একটা মানুষ আর ভাল খারাপের পার্থক্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
এখানেই ধর্মের প্রয়োজন। ধর্ম মানুষকে একটা Constant Reminder Process এ অভ্যস্ত করে। কিসের Reminder? ভাল এবং মন্দের মধ্যে পার্থক্যের Reminder. ধর্ম বার বার ভাল এবং খারাপগুলোর মাঝের পার্থক্য মনে করিয়ে দিয়ে দিয়ে মানুষের ভেতরের পশুটাকে দমন করতে সাহায্য করে।
যেমন ধর্ম বলছে মদ পান হারাম। হারাম কেন বলছে? কারণ এটি মানুষের স্বাভাবিক বিবেক বুদ্ধিকে অকেজো করে দেয় এবং মানুষ মাতাল অবস্থায় যে কোন খারাপ কাজ করে বসতে পারে।
ইংল্যান্ড এ মদ্যপ অবস্থায় ঘরে এসে বাবা শিশুকে ধর্ষণ করে, পাবে ক্লাবে জঘন্যতম কাজ কারবার করে, রাস্তায় পরে থাকে, কেউবা আবার এক সাথে অতিরিক্ত মদ পান করে মারা যায়, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালাতে গিয়ে দুর্ঘটনা তো অহরহ ব্যাপার। শুক্রবার থেকে শনিবার রাত পর্যন্ত এম্বুলেন্স সার্ভিসগুলো হয়রান হয়ে যায় মদ্যপ, নেশাগ্রস্তদের সেবা দিতে গিয়ে।
এখানেই ধর্ম একটা সুশৃঙ্খলিত জীবনপথ দেখিয়ে দেয়। আর সেটা করা হয় বার বার Reminder দেবার মাধ্যমে। এমন করে ধর্ম প্রতি পদে পদেই Reminders সেট করেছে, যা মানুষের জীবনকে শৃঙ্খলা শেখায়।
প্রতি শুক্রবারের জুমার যে খুতবা, সেটা সাপ্তাহিক Reminder। যেখানে ইমাম সবাইকে প্রতি খুতবাতেই একটা বিষয়ে Reminder দেন।
কুরআনের কথা যদি বলি, এটা-তো পুরোটাই Remindings দিয়ে ভরপুর। আল্লাহ বার বার ভাল মন্দের তফাত মনে করিয়ে দিচ্ছেন। ভালর ফলাফল, মন্দের ফলাফল মনে করিয়ে দিচ্ছেন, এবং মনে করিয়ে দিচ্ছেন উদাহরণ দিয়ে দিয়ে। নবী রাসূলের উদাহরণ, তাদের জীবনের বিভিন্ন ঘটনার উদাহরণ।
এতকিছুর পরও আমরা নিজেদের এই Reminding process টা নিতে চাইনা। বলি ধর্ম প্রয়োজনীয়। আবার সেই আমরাই যখন Reminder বিহীন চলার কারণে অপরাধ প্রবণ সমাজের বেহাল দশায় পতিত হই, তখন ধর্ষণ, খুনের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে পরি।
হ্যাঁ, প্রতিবাদ দরকার, প্রতিবাদ দরকার মানুষের ভেতরের পশুটাকে কিভাবে দমন করে রাখা যায়, সেই সিস্টেম চালু করা হচ্ছেনা কেন তার প্রতিবাদ দরকার সব থেকে বেশি। এবং এই প্রতিবাদ এক চিরন্তন প্রতিবাদ। প্রতিটা মানুষের জন্য প্রতি মুহূর্তে এই প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হবে। আর সেটা রাস্তায় নেমে কয়েকদিন প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়ালে হবে না মোটেই।
আগে ভেবে দেখা দরকার, ভেতরের পশুটাকে কতটুকু দমন করার উপাদান পাচ্ছি বা দিচ্ছি সমাজে। তনুদের যারা ধর্ষণ করে, তাদের ভেররের পশুগুলোকে যতদিন না দমন করার Process মানুষ চর্চা করবে, ততদিন এইসব প্রতিবাদে কোন কাজ হবে না।

Facebook Comments

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.